দ্বীনি শিক্ষার অগ্রগতিতে শালুকপাড়া মাদ্রাসার ভূমিকা

অবক্ষয়ের আবর্তে যখন আমরা সকলেই অল্প বিস্তর আবর্তিত, সমাজজীবন অনেকাংশে বিপর্যস্ত, নান্দনিক সৃষ্টিশীলতা ভঙ্গ প্রায়। সৃষ্টি ভুলে যাচ্ছে তার স্রষ্টাকে, ধরাতলে আসার উদ্দেশ্য বিস্মৃত প্রায়। বিশ্ব চরাচর যে, একই পরিবার, আমরা যে সবাই একই পরিবারের সদস্য ভুলে যেতে বসেছি সে কথা। স্বার্থান্ধতা, সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা, নিজেকেদিয়েই মগ্ন থাকার অন্ধকারে নিমজ্জিত ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজ ও দেশ। সংকটের এই যুগ সন্ধিক্ষণে আপামর জনসাধারণের সেবায় ব্রতী হওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে, স্রষ্টা ও সৃষ্টির সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে।হতাশাগ্রস্ত সমাজ ও জীবনকে গড়ে তুলতে হাওড়া জেলার ঐতিহ্যবাহী শীর্ষস্থানীয় পূর্ণাঙ্গ আদর্শ দরসে নিজামী বহুমুখী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শালুকপাড়া মাদ্রাসা আশরাফুল উলুম -র-ভিত্তি প্রস্তর পাঁচ দশক পূর্বে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে ,কোন এক শুভক্ষণে এক ঝাঁক সোনালী ব্যক্তিবর্গের গৌরবময় উপস্থিতির মাধ্যমে রাখা হয়। বর্তমানে এই চারা গাছটি আল্লাহর অপার করুণায় আপনাদের অকুণ্ঠ দুয়ায় তিলে তিলে মহীরুহতে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠা লাভের পরপরই এই প্রতিষ্ঠান নিজ অভিষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে অগ্রগামী হয়। মনে রাখতে হবে যে, শালুকপাড়া মাদ্রাসা দরসে নিজামি মাদ্রাসা।
উপমহাদেশে মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ
প্রবাদপ্রতিম পন্দিত প্রবর আব্দুল হাই হাসানী নদভী উপমহাদেশে মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার ক্রমবিকাশকে, চার ভাগে ভাগ করেছেন। তথা প্রথম ভাগে সপ্তম হিজরী শতকের শুরু থেকে নবম হিজরী শতকের শেষ পর্যন্ত প্রায় দুশো বছর। হিজরী নবম শতকের শেষে মুলতান থেকে শায়েখ আবদুল্লাহ উসমানী ও তার সতীর্থ শায়েখ আজিজুল্লাহ দিল্লীতে আসেন ও তৎকালীন দিল্লীর সুলতান সিকান্দার লোদী (শাসনকাল ১৪৮৯–১৫১৭) তাদের প্রতি বিশেষ মর্যাদা প্রদর্শন করেন। এখান থেকেই শুরু হলো দ্বিতীয় কালপর্ব এই সময়ে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান শাখার চর্চা বৃদ্ধি পায়। তৃতীয় কালপর্বেও এই ধারা অব্যাহত থাকে। আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬-১৬০৬) ইরানি কিছু ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান শাখার চর্চা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। আবুল ফজল আল কাযরাবানী, আবুল ফজল হুসাইন ও ফাতহুল্লাহ শীরাযী বাদশা আকবরের নৈকট্য লাভ করেন ও শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, আকবরের পিতা সম্রাট হুমায়ুন সেনানায়ক শেরশাহের কাছে পরাজিত হয়ে ইরানের সাফাবী শাসকদের সাহায্য গ্রহণ করেন ও ইরানি প্রভাবের পথ খুলে দেন। তবে এই তৃতীয় কালপর্বে কিছু ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হিজাযে যান ও হাদিসের চর্চা বিস্তারে চেষ্টা চালান। চতুর্থ কালপর্বে দরসে নেজামী প্রভাব বিস্তার করে।
দরসে নেজামী ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
দরসে নেজামি- ১৬৭৭-৭৮ সালে বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহালী শহরে জন্ম গ্রহণকারী মোল্লা নেজামুদ্দিন সাহালাভী কর্তৃক প্রণীত আরবী শিক্ষা পদ্ধতিকে দরসে নেজামি বলে আখ্যায়িত করা হয়। সামান্য পরিবর্তনসহ এই পদ্ধতিই আরবী মাদরাসা সমূহে আজও বিদ্যমান। এগারটি স্বতন্ত্র বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত হয় দরসে নেজামি। শ্যামপুর থানার অন্তর্গত নাকোল অঞ্চলের শালুকপাড়া গ্রামে 1970 খ্রিস্টাব্দে শালুকপাড়ামাদ্রাসা আশরাফুল উলুম প্রতিষ্ঠা হয়। উক্ত প্রতিষ্ঠানের মূল পরামর্শদাতা ছিলেন ওলানপাড়া নিবাসী সুফিসাধক বহুগ্রন্থ প্রণেতা হযরত মাওলানা কাজী আবু সালেহ শামসুল আলম সাহেব এবং শালুকপাড়া নিবাসী হযরত মাওলানা সুলাইমান সাহেব। ভূমিদাতা অনেকেই আছেন (আল্লাহ সেই দানবীর ভূমিদাতাগণকে উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং তার আওলাদগণকে বরকতে ভরিয়ে দিন) তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মরহুম মাস্টার জয়নাল আবেদীন সাহেব রাইদীঘি। উক্ত প্রতিষ্ঠান প্রথমে মক্তব আকারে প্রতিষ্ঠিত হয়। সর্ব প্রথম শিক্ষক ছিলেন মাওলানা মোঃ লোকমান সাহেব ও মরহুম মৌলবি মোজার আলি খান। শ্রদ্ধাস্পদ সভাপতি সাহেব ছিলেন, আল্লাহভীরু সুফিসাধক জনাব হাজী আহমাদ হোসেন সাহেব, বারাগোহাল উলুবেড়িয়া। মাননীয় সম্পাদক ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় মান্যবর জনাব মাষ্টার সৈয়দ আহমদ সাহেব শালুকপাড়া।
প্রশাসনিক বিকাশ ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা
অতঃপর হিফজ বিভাগের শুভ সূচনা হয়। যথাক্রমে মাওলানা বিভাগের প্রাথমিক ক্লাসগুলির দ্বারোদঘাটন করা হয়। তদানীন্তন শিক্ষক হিসেবে আব্দুল মাতিন সাহেব, সম্পাদক ছিলেন জনাব শেখ জামাল উদ্দিন সাহেব। পরিসরের সীমাবদ্ধতার কারণে সম্যকভাবে সমস্ত সম্পাদক সভাপতি মন্ডলীর নাম উল্লেখ করার স্বাদ থাকলেও সাধ্য নেই। আল্লাহই তাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন। ১৯৭৮ সালে জনাব হাফেজ আব্দুল হামিদ সাহেব মাদ্রাসার নব নাজিম নিযুক্ত হন। পূর্বসূরিদের প্রদত্ত আমানত তথা প্রতিষ্ঠানের শ্রী বৃদ্ধির জন্য অভাব দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে লড়াই করে মাদ্রাসার উন্নতিকে তরান্বিত করেন। তাঁর যোগ্য সঙ্গ দান করেন দ্বীনের আরেক অতন্দ প্রহরী হাজী আহমদ হোসেন সাহেব শশাটী। অতঃপর সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন উদ্ভবপুর নিবাসী কাজী শাহজাহান সাহেব তারপর পুনর্বার সর্বসম্মতিক্রমে মাওলানা রুহুল আমিন সাহেব সম্পাদক নিযুক্ত হন। তিনিও প্রতিষ্ঠানের ক্রমাগত উন্নতি অব্যাহত রাখেন। অতঃপর মাদ্রাসার যথাক্রমে সম্পাদক নিযুক্ত হন বাগনান নিবাসী মোহাম্মদ ইয়াহিয়া সাহেব ও বানিয়া বেলপুকুর নিবাসী হাজী ক্বাসেম আলী সাহেব এবং উলুবেড়িয়া নিমদিঘি নিবাসী মুফতি ইব্রাহিম সাহেব।
আধুনিক বিস্তার ও সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম
২০১৭ সালে মাদ্রাসার সমূহ দায়-দায়িত্বের পরিচালনার দায়ভার সর্বসম্মতিক্রমে দেওয়া হয় মাওলানা মুসা কালিমুল্লাহ কাসেমী সাহেবকে। এবং অদ্যাবধি তিনি একই পদে অধিষ্ঠিত আছেন। তাঁর সময়কালে আল্লাহ তাআলা প্রতিষ্ঠানের প্রভূত উন্নতি দান করেন। এই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে বহুমুখী প্রতিষ্ঠান যেখানে একই ছাদের তলায় শত শত ছাত্র কোরআনকে আত্মস্থ করছে। পাশাপাশি চলছে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ মাওলানা কোর্স। ২০১৮ সাল থেকে স্নাতকোত্তর বর্ষ তথা বিশুদ্ধ দশটি হাদীস গ্রন্থের পাঠদানের মাধ্যমে সুসম্পন্ন করানো হচ্ছে। চলছে অভিনব ইংলিশ ডিপ্লোমা কোর্স…
মাদ্রাসা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও আখেরাতের দৃষ্টিভঙ্গি
পরিসমাপ্তিতে বলে রাখি যে, মাদ্রাসা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? আসুন এই বিষয়টাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করি। প্রতিটি মানুষকে তিনটি জীবন অতিবাহিত করতে হয়… (এরপরের সম্পূর্ণ অংশ—যেখানে তিন জীবনের ব্যাখ্যা, হাতি ও শকুনের উদাহরণ, শিক্ষা ও নৈতিকতার বিশ্লেষণ, আখেরাতের ব্রেকের উপমা, এবং মাদ্রাসা শিক্ষার স্বতন্ত্রতার আলোচনা আছে—সবই অপরিবর্তিতভাবে এই শিরোনামের অধীনে থাকবে।)
